আমাদের দেখার জায়গাচুনতির সন্তান হিসেবে গ্রামের কথা বলতে গেলে আমার মনে প্রথমে ভালোবাসা আসে। কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে মূল্যায়ন শেষ হয় না। যে মাটিতে আমাদের জন্ম, যে মানুষ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সেই জনপদকে দেখতে হয় তার সৌন্দর্য ও অর্জনের সঙ্গে তার অপূর্ণতা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের দিকেও চোখ রেখে। আমরা চুনতির প্রশংসা করব, আবার প্রশ্নও করব: গ্রামের প্রতিটি শিশু কি শেখার সমান সুযোগ পাচ্ছে? পাহাড় ও বন কি নিরাপদ থাকছে? বিপদে পড়া প্রতিবেশীর পাশে কি আমরা যথেষ্ট দাঁড়াচ্ছি?এই প্রশ্নগুলো চুনতিকে ছোট করে না। বরং গ্রামের প্রতি আমাদের সম্পর্ককে দায়িত্বশীল করে। দূরে থেকেও আমরা তাকে কেবল স্মৃতির একটি সুন্দর ছবি হিসেবে দেখব না। চুনতি একটি জীবন্ত সমাজ; এখানকার মানুষ, পরিবেশ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির যত্ন নিতে হয়।পাহাড় সবুজ আর জীববৈচিত্র্যচুনতির ভূদৃশ্যের নিজস্ব ভাষা আছে। ছোট ছোট টিলা, গাছপালায় ঢাকা ঢাল, ফসলের জমি, বসতির পথ আর দূরের বন মিলিয়ে এমন এক দৃশ্য তৈরি হয়, যা সহজে ভুলে থাকা যায় না। ঋতু ও দিনের আলোয় সেই দৃশ্যের রং বদলায়। আমাদের শৈশবের পথ, বাড়ির উঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই প্রকৃতির মধ্যেই ছিল। তাই চুনতির সৌন্দর্য কেবল দর্শনার্থীর চোখে দেখা দৃশ্য নয়; এখানকার মানুষের জীবনযাপনেরও অংশ।চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য আমাদের মনে করায়, সবুজের মধ্যে অন্য প্রাণীরও বাস আছে। বন ও হাতির চলাচলের পথের কথা বলতে হলে মানুষের নিরাপত্তা এবং প্রাণীর আবাস দুটোই বিবেচনা করতে হয়। গাছ কাটা, আবাসভূমি সংকুচিত হওয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন যে ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষ, বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। সুন্দর গ্রামের উত্তরাধিকার শুধু ভোগ করার সম্পদ নয়; পরের প্রজন্মের জন্য রক্ষা করার দায়িত্বও।শিক্ষার দীর্ঘ পথচুনতিকে বোঝার আরেকটি পথ তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। মাদরাসা, বিদ্যালয় ও কলেজে বহু প্রজন্মের মানুষ পড়েছেন, পড়িয়েছেন এবং অন্যদের পড়ার সুযোগ তৈরি করেছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বলেই এই ইতিহাস শেষ হয় না। শিক্ষকের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, পরিবারের ত্যাগ এবং সমাজের সহযোগিতায় শিক্ষা সত্যিকার শক্তি হয়। চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসায় আমার দীর্ঘ শিক্ষাজীবন সেই সত্য আমাকে নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝিয়েছে।এখনকার মূল্যায়নে শুধু অতীতের গৌরব গণনা করলে চলবে না। মেয়েদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, বই পড়ার অভ্যাস, যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক এবং কর্মজীবনের প্রস্তুতি—এসব ক্ষেত্রেও সমান মনোযোগ দরকার। শিক্ষার আলো তখনই গ্রামে ছড়ায়, যখন কম সুযোগ পাওয়া পরিবারের সন্তানও তার নাগাল পায়।সম্প্রীতির সামাজিক ভাষাগ্রামের শক্তি মানুষের সম্পর্কেও থাকে। বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অসুস্থতা, শোক কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে প্রতিবেশীরা পরস্পরের পাশে দাঁড়ালে যে আস্থা তৈরি হয়, তা কোনো ভবনের দেয়ালে দেখা যায় না। চুনতির বিয়ের আসরের শেরখানি এই সামাজিক জীবনের একটি লোকজ পরিচয়। গানের সুর ও মিলিত আনন্দের মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের অনুষ্ঠান অনেকের অংশগ্রহণের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। প্রথার রূপ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে; এর ভেতরের পারস্পরিকতার মূল্য হারানো উচিত নয়।সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা উৎসবের দিনে নয়, মতভিন্নতা বা সংকটের সময়ে। ধর্মীয় পরিচয়, পেশা, আর্থিক অবস্থা কিংবা প্রজন্মের পার্থক্য সত্ত্বেও সবাই যেন সম্মান ও নিরাপত্তা পায়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। গ্রামের স্মৃতি শুধু নিজের গোষ্ঠীর স্মৃতি হলে তা অসম্পূর্ণ থাকে। চুনতির পূর্ণ পরিচয় গড়ে ওঠে তার সব মানুষের অংশগ্রহণে।নতুন উদ্যোগের তাৎপর্যচুনতির সাম্প্রতিক উদ্যোগে পুরোনো শিক্ষানুরাগের নতুন প্রকাশ দেখি। চুনতি লাইটহাউসের গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার শিক্ষা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল আয়োজন শেখার পরিসরকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিয়ে যায়। চুনতি ডটকমের শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও সামাজিক কার্যক্রম, স্থানীয় সংগঠনগুলোর সহায়তা এবং প্রবাসী চুনতিবাসীর যোগাযোগও দেখায় যে নিজের গ্রামকে মনে রাখার অনেক বাস্তব উপায় আছে।এসব উদ্যোগের মূল্যায়নে শুধু অনুষ্ঠানের সংখ্যা নয়, ফল দেখতে হবে। কোনো শিশুর পড়াশোনা সহজ হলো কি? কোনো তরুণ দক্ষতা অর্জন করল কি? বই ও প্রশিক্ষণের সুযোগ মেয়েদের এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের কাছে পৌঁছাল কি? ভালো কাজের ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছ হিসাব থাকলে মানুষের আস্থা বাড়ে এবং উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়।চুনতি লাইটহাউস প্রতিষ্ঠার জন্য মিসেস সুরাইয়া জান্নাত খান, তাঁর স্বামী মাসুদ খান এবং খান পরিবারের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করি। চুনতি খান ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই গ্রন্থাগার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে চুনতির ছেলে-মেয়েরা বই পড়া, কম্পিউটার ব্যবহার ও কাজের দক্ষতা শেখার সুযোগ পাচ্ছে। ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রশিক্ষক, উপকরণ ও নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া তাঁদের উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। গ্রামের তরুণদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি করা চুনতির শিক্ষানুরাগী উত্তরাধিকারের বাস্তব সম্প্রসারণ।খান পরিবার ও চুনতি খান ফাউন্ডেশনের নিয়মিত বিনামূল্যের চক্ষুশিবির আয়োজনও আন্তরিক প্রশংসার দাবিদার। চিকিৎসক ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে এ উদ্যোগে চুনতির এবং আশপাশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একবারের আয়োজনের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে শিবির চালানো কঠিন; তাই আয়োজক পরিবার, চিকিৎসক, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমকে একসঙ্গে স্বীকার করা উচিত। চোখের চিকিৎসা প্রয়োজন এমন মানুষকে পরবর্তী সেবা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও এই কাজের মূল্য বাড়ায়।চুনতি খান ফাউন্ডেশনের আরেকটি বিশেষ অবদান মেয়েদের জন্য একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় এতিম ছাত্রীদের জন্য তা নিয়মিত পরিচালনা করা। আশ্রয় ও শিক্ষার প্রয়োজন যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদের পাশে দীর্ঘদিন থাকা ভবন নির্মাণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রন্থাগার, প্রশিক্ষণ ও চক্ষুশিবিরসহ ফাউন্ডেশনের অন্যান্য মানবিক উদ্যোগের পাশাপাশি এই এতিমখানার কাজও চুনতির মানুষের কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।
নাজির-নাজের এডুকেশন অ্যান্ড ট্রাস্টের মানবিক উদ্যোগও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করি। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর চুনতির বিপন্ন ও অভাবগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র এবং রমজানে ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের আয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেয়; দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের ঘর এবং মসজিদ, মক্তব, হিফজখানা ও মাদরাসা নির্মাণেও অনুদান দেয়। ফাতেমা বাতুল মহিলা মাদরাসার জন্য ওয়াক্ফ হিসেবে জমি দানও তার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। ট্রাস্টের সদস্য প্রফেসর ড. আবু বকর রফিক আহমদ ও প্রফেসর ড. আবু ওমর ফারূক আহমদ চুনতির নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে বিশেষ অনুদান দিয়ে এসেছেন। দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রফেসর ড. আ জ ম ছাদেকের অবদানও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। মৌসুমি কষ্ট ও রমজানের ব্যয় সামলাতে খাদ্য ও বস্ত্রের এই সহায়তা উপকারভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর একটি বাস্তব উপায়। সহায়তা পৌঁছানোর সময় প্রয়োজনের ভিত্তিতে বাছাই এবং প্রত্যেকের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা এই কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক।চুনতি ডটকমের উদ্যোগে ইছহাক মিয়া সড়কে আয়োজিত ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতাও গ্রামের নতুন পরিচয়ের অংশ। দেশের বিভিন্ন জেলার দৌড়বিদেরা চুনতির পাহাড়-সবুজের পথে একত্র হয়েছেন; স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠকেরা একটি গ্রামীণ আয়োজনকে বৃহত্তর ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত করতে কাজ করেছেন। এই উদ্যোগে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, তরুণদের অংশগ্রহণ ও চুনতির সৌন্দর্য তুলে ধরার সুযোগ আছে। আয়োজকেরা চুনতির পরিচিতি আন্তর্জাতিক পরিসরেও পৌঁছানোর লক্ষ্য জানিয়েছেন; ভবিষ্যতে বিদেশি প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণের সুযোগ হলে সেই পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।আমাদের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া পথআজ চুনতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কথা বলার আগে তাঁদের কথা মনে করা দরকার, যাঁরা এসবের ভিত তৈরি করেছিলেন। পূর্বসূরিদের মধ্যে আলেম ও শিক্ষক যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন জমিদাতা, অভিভাবক, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং নিঃস্বার্থ কর্মী। তাঁরা নিজেদের সন্তানদের পড়িয়েছেন, অন্য পরিবারের সন্তানদের জন্যও জায়গা করে দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে অর্থ ও শ্রম দিয়েছেন। তাঁদের কাজের মূল্য কেবল পরিচিত কয়েকটি নামের তালিকায় ধরা যায় না।চুনতি হাকিমিয়া মাদরাসার দীর্ঘ পরম্পরা গ্রামের দ্বীনি ও সাধারণ শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকারের সাক্ষ্য দেয়। চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হাকিম (বড় মওলানা সাহেব) ও শাহ্ সুফি মাওলানা নজীর আহমদ (প্রকাশ হুজুর)-কে এখানে বিশেষ শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে শিক্ষক, পরিচালনাকারী ও দাতাদের ধারাবাহিক কাজের ফলেই বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়েছেন। মাদরাসার দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী অধ্যক্ষ আল্লামা শাহ আবু তাহের এম. মাজের (স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত)-এর নেতৃত্ব ও শিক্ষাসেবাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন। তাঁর দীর্ঘ অধ্যক্ষতার সময়ে শিক্ষাদান ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার যে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন, তা চুনতির শিক্ষার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চুনতি ডটকমে সংরক্ষিত একটি পুরোনো দলিল থেকে জানা যায়, মাদরাসার উন্নয়নে সরকারি সহায়তা চেয়ে কর্তৃপক্ষ ১৯৪০ সালে আবেদন করেছিল। এই ছোট তথ্যটি মনে করায়, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একদিনের কাজ ছিল না; প্রয়োজন বুঝে উদ্যোগ নেওয়া ও সহায়তা জোগাড় করার চেষ্টা চলেছে বহু বছর।প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও দান ও সহযোগিতার এমন নজির আছে। চুনতি হাকিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের জন্য এস্তফাজুর রহমান জমি দিয়েছিলেন; পরে স্থানীয় সমাজকর্মীদের অনুরোধে যোগেশ পাল আরও জমি দেন। এই ইতিহাসে কেবল জমির পরিমাণ নয়, ভিন্ন পেশা ও পরিবারের মানুষের একটি সাধারণ উদ্দেশ্যে একত্র হওয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁদের দেওয়া জায়গায় পরের প্রজন্মের শিশুরা পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
আমাদের পূর্বসূরিরা সাংস্কৃতিক পরিসরও রেখে গেছেন। উর্দু ও ফারসি কবিতার চর্চা, লোকগান, শেরখানি, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে বিনিময় তৈরি হয়েছিল, তা চুনতির স্বাতন্ত্র্য গড়েছে। পরিবারের নারী-পুরুষের অনেক অদৃশ্য শ্রম—শিশুকে পড়তে পাঠানো, অতিথি সামলানো, অসুস্থ প্রতিবেশীকে দেখা—এই সমাজের ভিত মজবুত করেছে। তাঁদের সবার অবদান স্বীকার করাই উত্তরাধিকারের প্রতি ন্যায্য আচরণ।পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধার সবচেয়ে ভালো প্রকাশ হবে তাঁদের কাজকে বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁরা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছিলেন; আমাদের তা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। তাঁরা সামাজিক বন্ধন ধরে রেখেছিলেন; আমাদের তা মতভিন্নতার মধ্যেও বজায় রাখতে হবে। তাঁরা চুনতির মাটিতে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছিলেন; আমাদের পাহাড়, বন ও মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনা করে সেগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে।সাম্প্রতিক পূর্বসূরিদের মধ্যে মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বীর বিক্রমের অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। শিক্ষা ও যোগাযোগের উন্নয়নকে তিনি একসঙ্গে দেখেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে ইছহাক মিয়া সড়ক চুনতির দূরের পাড়াগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খুলে দেয়; খাল ও বিচ্ছিন্ন পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়, বাজার কিংবা চিকিৎসাসেবায় পৌঁছানোর কষ্ট কমানোর লক্ষ্য ছিল এই কাজে। সড়ক ও সেতু-সংযোগের উন্নয়নে তাঁর প্রচেষ্টার পাশাপাশি মায়ের নামে মেহেরুন্নেছা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পানত্রিশা অঞ্চলে বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য জমি দেওয়ার অবদানও স্মরণ করা উচিত। এসব কাজে তাঁর সঙ্গে যাঁরা জমি, শ্রম, প্রশাসনিক সহায়তা ও সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাঁদের অবদানও একই ইতিহাসের অংশ। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও চুনতিতে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করি। একইভাবে যে চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসায় তিনি নিজে পড়েছিলেন, তার উন্নয়নেও তাঁর দান ও সহযোগিতা ছিল। শিক্ষা, যোগাযোগ ও মাতৃস্বাস্থ্যকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের উদ্যোগের জন্য পথ দেখায়। চুনতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি মাসিক বেতন-ভাতা সহায়তা বা এমপিও ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্যও তিনি প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক স্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক পাঠদান নিশ্চিত করার গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন—তাঁর এই প্রচেষ্টা সেই বৃহত্তর শিক্ষাভাবনার অংশ।মাটির সন্তানদের করণীয়আমরা যারা চুনতিতে আছি এবং যারা বাইরে বসবাস করি, সবার দায়িত্ব এক রকম নয়; তবু সবার কিছু দেওয়ার আছে। কেউ সময় দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারেন, কেউ গ্রন্থাগারে বই দিতে পারেন, কেউ দরিদ্র শিক্ষার্থীর ফি বা যাতায়াতে সাহায্য করতে পারেন। প্রকৃতি রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, তরুণদের পেশাগত পরামর্শ এবং প্রবীণদের মুখে শোনা ইতিহাস নথিবদ্ধ করাও মূল্যবান কাজ।
এর জন্য শুরুতে বড় ঘোষণা প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিয়মিত ছোট কাজ, স্থানীয় মানুষের কথা শোনা এবং সাহায্যের সিদ্ধান্তে তাঁদের মর্যাদা বজায় রাখা। গ্রাম সম্পর্কে দূর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চুনতির উন্নয়নের কথায় তাই শিক্ষক, নারী, তরুণ, কৃষক, ব্যবসায়ী ও বনসংলগ্ন পরিবারের অভিজ্ঞতাকে জায়গা দিতে হবে।প্রথম দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর শিক্ষার পথ খোলা রাখা। আর্থিক অসুবিধায় পড়া শিক্ষার্থীকে খুঁজে সহায়তা দেওয়া, ঝরে পড়ার কারণ বোঝা, মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং মাদরাসা ও বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ করা—এসব কাজে স্থানীয় শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত সহযোগিতা প্রয়োজন। বাইরে থাকা চুনতিবাসী অর্থের পাশাপাশি পাঠচক্র, পরামর্শ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন।
দ্বিতীয় দায়িত্ব পাহাড়, বন ও পানির উৎসের যত্ন। গ্রামের পথ বা বসতি উন্নয়নের সময় পাহাড় কাটার ক্ষতি, পানি নিষ্কাশন এবং বন্যপ্রাণীর চলাচল ভাবতে হবে। বনসংলগ্ন পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গাছ লাগানোর চেয়ে লাগানো গাছ বাঁচিয়ে রাখা এবং বর্জ্য যেখানে সেখানে না ফেলা অনেক সময় বেশি জরুরি।তৃতীয় দায়িত্ব হলো পারস্পরিক সহায়তায় ন্যায্যতা রাখা। সহায়তা যেন আত্মীয়তা বা পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে, প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে পৌঁছায়। প্রবীণ, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং আয় কম এমন পরিবারগুলোর খবর নিয়মিত নেওয়া যায়। উদ্যোগের আয়ব্যয় ও সিদ্ধান্ত খোলাখুলি জানালে মানুষ আস্থা পায়; তরুণেরাও দায়িত্ব নিয়ে অংশ নিতে শেখে।চতুর্থ দায়িত্ব আমাদের বহুমাত্রিক ইতিহাস ধরে রাখা। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা, প্রবীণদের মুখে শোনা স্মৃতি, স্থানীয় গান ও শেরখানির ঐতিহ্য, পুরোনো ছবি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। স্মৃতি সংগ্রহের সময় কারও বক্তব্যকে যাচাই ছাড়া ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা উচিত নয়। এতে চুনতির আগামী প্রজন্ম নিজেদের শিকড় জানতে পারবে এবং অন্যের অবদানও সম্মান করতে শিখবে।সবশেষে প্রয়োজন তরুণদের জায়গা দেওয়া। বিতর্ক, বইপড়া, খেলাধুলা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের কাজে যুক্ত করা যায়। নারী ও পুরুষ, গ্রামের বাসিন্দা ও প্রবাসী—সবার কথা শুনে ছোট লক্ষ্য স্থির করা, কাজের অগ্রগতি দেখা এবং ভুল হলে সংশোধন করা চুনতির প্রতি আমাদের দায় পালনের বাস্তব পথ।চুনতি জামে মসজিদ নির্মাণে শাবাবের আন্তরিক সহায়তা বিশেষভাবে স্বীকার করতে চাই। গ্রামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়তে তরুণদের সময়, শ্রম ও সহযোগিতা যে কত মূল্যবান, তাঁদের অংশগ্রহণ তা মনে করিয়ে দেয়। তাঁদের পাশে ছিলেন আরও অনেক দাতা, মুরব্বি ও স্বেচ্ছাসেবক; সম্মিলিত এই কাজের জন্য সবাই কৃতজ্ঞতা ও দোয়ার দাবিদার। চুনতি জামে মসজিদে তাঁদের অবদানের এই স্মরণকে মসজিদে বায়তুল্লাহর পৃথক পুনর্নির্মাণ প্রস্তাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।মসজিদে বায়তুল্লাহ ও সীরাতের আয়োজনের প্রতি আমাদের দায়চুনতির সীরাত ময়দান ও মসজিদে বায়তুল্লাহ বহু মানুষের ইবাদত, শিক্ষা ও মিলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী চুনতি সীরাতুন্নবী ﷺ মাহফিলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা শাহ হাফেজ আহমদ (শাহ সাহেব কিবলা)-কে আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর সূচিত মাহফিল চুনতিতে ৫৬ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে; নবীজির জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা এবং মানুষের মিলনের ক্ষেত্রে এ আয়োজন এক স্বতন্ত্র ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। পূর্বসূরিরা যে পরিসর গড়ে দিয়েছেন, তার প্রয়োজন এখন নতুনভাবে বিচার করে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ বা প্রয়োজনমতো উন্নয়নে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। মুসল্লিদের জায়গা, নিরাপদ প্রবেশপথ, অজু ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা, নারী ও প্রবীণদের প্রয়োজন, জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার পথ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ—সবই পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের সঙ্গে ব্যবহারযোগ্যতা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা সমান গুরুত্ব পাবে।আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী ﷺ আয়োজনের জন্য একটি বহুমুখী মিলনায়তনের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এর ব্যবহার শুধু বছরের কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সীরাত আলোচনা, গবেষণা সম্মেলন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের বিতর্ক, বইমেলা ও জনকল্যাণমূলক সভার জন্যও জায়গাটি কাজে লাগতে পারে। উপযুক্ত ধ্বনি ও দৃশ্য ব্যবস্থা, ভাষান্তরের সুযোগ, দূর থেকে অংশগ্রহণের প্রযুক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশাধিকার এবং অতিথি ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রয়োজন পরিকল্পনায় রাখতে হবে।এ দুটি কাজের জন্য মসজিদ ও মাহফিল পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় আলেম, প্রকৌশলী, স্থপতি, শিক্ষাবিদ, নারী প্রতিনিধি এবং দেশ-বিদেশে থাকা চুনতিবাসীর সঙ্গে আলোচনা জরুরি। বর্তমান স্থাপনা ও জমির অবস্থা যাচাই, ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব, ধাপে ধাপে অর্থ সংগ্রহ এবং নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদন ছাড়া বড় নির্মাণকাজে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আমরা যে সহায়তা দেব, তার লক্ষ্য হবে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী সেবা এবং পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া আস্থার মর্যাদা রক্ষা।দারুল মুতালাআ সম্পন্ন করার দায়িত্বচুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসায় মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল হাই নিজামী যে দারুল মুতালাআর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা সম্পন্ন করতেও আমাদের আরও সহায়তা প্রয়োজন। পাঠাগার ও অধ্যয়নকক্ষের একটি কার্যকর পরিসর শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়তে, আরবি-বাংলা-ইংরেজি গ্রন্থ ব্যবহার করতে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গবেষণার অভ্যাস গড়তে সাহায্য করবে। তাঁর উদ্যোগকে স্বীকার করার পাশাপাশি কাজটি সম্পূর্ণ ও সচল রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করাই হবে যথার্থ সম্মান।প্রথমে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসমাপ্ত কাজের তালিকা, প্রয়োজনীয় অর্থ এবং পরিচালনার দায়িত্ব স্পষ্ট করা উচিত। এরপর পাঠের উপযোগী আসবাব, নির্ভরযোগ্য বই ও সাময়িকী, বইয়ের তালিকা ও ধারব্যবস্থা, আলো-বাতাস এবং প্রয়োজনমতো ডিজিটাল পাঠের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে করা যায়। চুনতির বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং দেশে-বিদেশে থাকা শুভানুধ্যায়ীরা নির্দিষ্ট কাজের জন্য সহায়তা করতে পারেন। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত গ্রন্থাগারিক সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনাও রাখতে হবে।চুনতিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নআমাদের শিক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস, স্থানীয় উদ্যোগ এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন বিবেচনায় চুনতিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আমি সামনে রাখতে চাই। গ্রামের শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়—বিশেষত যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য এই দূরত্ব বড় বাধা। একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় চুনতি ও আশপাশের জনপদের নারী-পুরুষকে শিক্ষার নতুন সুযোগ দিতে পারে। গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ে স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার যোগও তৈরি করতে পারে।এ স্বপ্ন বাস্তব করতে শুধু নাম ঘোষণা বা ভবনের জায়গা নির্বাচন যথেষ্ট নয়। প্রথমে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও পরিবারের চাহিদা, সম্ভাব্য বিষয়, শিক্ষক পাওয়া, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে স্বতন্ত্র সমীক্ষা প্রয়োজন। পাহাড় বা বনের ক্ষতি করে ক্যাম্পাস গড়া চুনতির স্বার্থে হবে না। জমি, যাতায়াত, আবাসন, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আগেই পরিকল্পনা করতে হবে। শিক্ষা কর্তৃপক্ষের বিধি ও মানের শর্ত পূরণ করে ধাপে ধাপে এগোনোই দায়িত্বশীল পথ।শুরুতে স্থানীয় কলেজ, মাদরাসা, লাইটহাউস এবং দেশের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ পাঠচক্র, শিক্ষক উন্নয়ন, স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রকল্প চালু করা যায়। চুনতির কৃতী সন্তান, শিক্ষাবিদ, দাতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তরুণদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত উদ্যোগপরিষদ গড়ে তোলা যেতে পারে। এই কাজগুলোর ফল দেখে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করলে স্বপ্নের ভিত শক্ত হবে। আমাদের পূর্বসূরিরা শিক্ষার দরজা খুলেছিলেন; পরের দরজাটি খোলার দায়িত্ব আমাদের।চুনতিতে আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্রের প্রয়োজনবিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নের পাশাপাশি চুনতিতে বিজ্ঞান ও ইসলামী গবেষণার একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখি। চুনতির প্রাচীন শিক্ষাচর্চা এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘিরে পরিবেশগত বাস্তবতা এই দুই ধারার গবেষণার জন্য প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র তৈরি করে। ইসলামী আইন, নৈতিকতা, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও অর্থনীতি নিয়ে দলিলভিত্তিক গবেষণার সঙ্গে বন, জীববৈচিত্র্য, পানি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সহাবস্থান নিয়ে মাঠভিত্তিক গবেষণা চলতে পারে। প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পদ্ধতি ও মান বজায় রাখতে হবে।“আন্তর্জাতিক” নামের যথার্থতা আসবে কাজের গুণ ও সহযোগিতার পরিসর থেকে। দেশের ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প, উন্মুক্ত বক্তৃতা, গবেষণা প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা এবং স্থানীয় তথ্যের দায়িত্বশীল সংরক্ষণ শুরু করা যায়। আরবি, বাংলা ও ইংরেজিতে গবেষণা বিনিময়ের সুযোগ থাকলে চুনতির শিক্ষার্থীরা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় অংশ নিতে পারবে। গবেষণার প্রশ্ন নির্ধারণে স্থানীয় মানুষকে শুনতে হবে; তাঁদের অনুমতি, তথ্যের গোপনীয়তা ও গবেষণার ফল তাঁদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে।কেন্দ্রটি গড়ার প্রথম ধাপে একটি ছোট পাঠাগার ও ডিজিটাল সংগ্রহ, গবেষণা নীতিমালা এবং কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। পরিচালনায় আলেম, বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও তরুণ গবেষকদের স্থান থাকতে হবে। অর্থায়ন ও গবেষণার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্য হলে আস্থা বাড়বে। এমন কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিতেও সাহায্য করবে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষায় না থেকে এখনই জ্ঞানচর্চার কাজ শুরু করতে পারবে।সৌরবিদ্যুতে আলোকিত চুনতির পরিকল্পনাসমগ্র চুনতিতে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছে দেওয়াও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত। মাদরাসা, বিদ্যালয়, লাইটহাউস, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, বাজার ও বাসাবাড়ির উপযুক্ত ছাদ থেকে এই কাজ ধাপে ধাপে শুরু করা যায়। এতে দিনের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ, প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের সেবার ধারাবাহিকতা এবং জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কম আয়ের পরিবার ও দূরের পাড়াগুলো যেন শেষ পর্যন্ত অপেক্ষায় না থাকে, সে জন্য শুরু থেকেই ন্যায্য অগ্রাধিকার ঠিক করা প্রয়োজন।প্রথম কাজ হবে ঘর ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহার, ছাদের নিরাপত্তা, রোদ পাওয়া, অর্থায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের বাস্তব সমীক্ষা। তার ভিত্তিতে কয়েকটি সরকারি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করে উৎপাদন, ব্যয় ও সমস্যা প্রকাশ করা যায়। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধি মেনে যেখানে উপযুক্ত সেখানে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে; জরুরি সেবার জন্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রয়োজন আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত। প্রশিক্ষিত স্থানীয় তরুণেরা স্থাপন, পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণে কাজ পেতে পারেন।সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নামে বন কেটে বা পাহাড় ক্ষতিগ্রস্ত করে বড় জমি দখল করা চুনতির পরিবেশ ভাবনার সঙ্গে মেলে না। আগে বিদ্যমান ছাদ ও স্থাপনার ব্যবহার, পরে প্রয়োজন হলে বিকল্প জায়গার পরিবেশগত মূল্যায়ন—এই ক্রমে এগোনো ভালো। প্রতিটি পর্যায়ে উপকারভোগী, খরচ, প্রযুক্তির মেয়াদ ও পুরোনো যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনার হিসাব প্রকাশ করলে “সৌরবিদ্যুতের চুনতি” কেবল স্লোগান থাকবে না; মানুষের কাজে লাগা একটি বাস্তব পরিকল্পনা হবে।মাদকমুক্ত ও নিরাপদ চুনতির জন্যচুনতিকে মাদক বিক্রি ও মাদকাসক্তির ক্ষতি থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবার, শিক্ষক, মসজিদ, তরুণ সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরদের আগেই সহায়তা করা সহজ হয়। খেলাধুলা, পাঠাগার, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ প্রতিরোধের অংশ হতে পারে। মাদক বিক্রির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন; গুজব ছড়ানো, কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করা বা নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া সমাজের ক্ষতি বাড়ায়।যাঁরা আসক্তিতে ভুগছেন, তাঁদের পরিবারকে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। গোপনীয়তা রক্ষা করে চিকিৎসক, পরামর্শসেবা এবং স্বীকৃত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সাহায্য করা প্রয়োজন। সুস্থ হয়ে ফিরে আসা মানুষের শিক্ষা, কাজ ও সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ফল ভালো হওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়। বিক্রি বন্ধে আইন প্রয়োগ এবং আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় মানবিক সহায়তা—দুই কাজের দায়িত্ব ও পদ্ধতি আলাদা করে বুঝতে হবে।নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ব্যবস্থাও গড়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ জনপথ ও প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে প্রয়োজন যাচাই করে আলো, জরুরি যোগাযোগের তথ্য এবং সীমিত পরিসরে ক্যামেরা স্থাপনের প্রস্তাব স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। কে ফুটেজ দেখতে পারবেন, কত দিন রাখা হবে এবং অভিযোগের জবাব কে দেবেন—এই নিয়ম আগে লিখিত করতে হবে। ব্যক্তিগত বাড়ি বা মানুষের চলাফেরার ওপর নির্বিচার নজরদারি গ্রহণযোগ্য হবে না। পাশাপাশি স্কুল, লাইটহাউস ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রতারণামূলক বার্তা, পরিচয় চুরি, অনলাইন হয়রানি এবং নিরাপদ পাসওয়ার্ড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।এই উদ্যোগগুলোর ফল বছরে অন্তত একবার পর্যালোচনা করা উচিত: অভিযোগ জানানোর পথ মানুষ জানে কি না, বিপদে দ্রুত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে কি না, চিকিৎসায় যেতে ইচ্ছুক পরিবার সহায়তা পাচ্ছে কি না এবং ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষিত আছে কি না। কেবল যন্ত্র বসালেই নিরাপত্তা তৈরি হয় না; আস্থা, প্রশিক্ষণ ও দায়িত্বশীল পরিচালনা তাকে কার্যকর করে।চুনতি সমাজকল্যাণ সমিতি ও পরিষদের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিচুনতিকে শান্তিপূর্ণ ও সংঘাতমুক্ত রাখতে চুনতি সমাজকল্যাণ সমিতি বা পরিষদ একটি দায়িত্বশীল সামাজিক ভূমিকা নিতে পারে। জমির সীমানা, প্রতিবেশীর সঙ্গে মতবিরোধ, পারিবারিক বা সামাজিক ভুল বোঝাবুঝির মতো বিষয়ে উভয় পক্ষ চাইলে একটি নিরপেক্ষ আলোচনার সুযোগ তৈরি করা যায়। স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের স্বেচ্ছামূলক মধ্যস্থতা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (ADR) একটি উদ্যোগ হতে পারে। এর লক্ষ্য হবে মন দিয়ে দুই পক্ষের কথা শোনা, তথ্য যাচাই করা এবং কারও ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে ন্যায়, ইনসাফ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করা।পরিষদের মধ্যস্থতাকারীদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলে সরে দাঁড়াতে হবে; নারী, প্রবীণ ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষের কথাও নিরাপদ পরিবেশে শোনা চাই। আলোচনা ও সম্মতির বিষয় লিখিতভাবে রাখা, ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা এবং আপস না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার পথ খোলা রাখা জরুরি। সহিংসতা, হুমকি বা গুরুতর অপরাধকে সামাজিক আপসের নামে চাপা দেওয়া যাবে না। পরিষদ একই সঙ্গে সামাজিক কল্যাণের উদ্যোগ সমন্বয়, বিশাল কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে সহযোগিতা এবং জনপরিসর নিরাপদ রাখার বিষয়েও স্থানীয় মানুষ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে পারে। এভাবে ন্যায্য প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে চুনতিতে শান্তি ও আস্থা বাড়ানো সম্ভব।শেষ কথাচুনতিকে মূল্যায়নের মাপকাঠি আমার কাছে তিনটি: তার মানুষ কতটা সম্মান নিয়ে বাঁচছেন, তার শিশুরা কতটা শেখার সুযোগ পাচ্ছে, আর তার প্রকৃতি কতটা সুরক্ষিত থাকছে। এই প্রশ্নে ভালো উত্তর পাওয়ার জন্য অতীতের অর্জন আমাদের সাহস দেবে; অপূর্ণতার স্বীকারোক্তি আমাদের পথ দেখাবে।মাটির সন্তান হিসেবে চুনতির প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাই কেবল স্মৃতিচারণ নয়। পাহাড়ের সবুজ, শিক্ষার পরম্পরা, শেরখানির মিলনমুখর সুর এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এ গ্রাম আমাদের আপন। আমরা যদি সম্মান, জ্ঞান ও দায়িত্ব নিয়ে তার পাশে থাকি, তবে চুনতি আরও সুন্দর এবং আরও ন্যায়সঙ্গত জনপদ হয়ে উঠতে পারে।তথ্যসূত্র
চুনতি ডটকম, “Chunati.com Marathon 2024,” https://chunati.com/registration/marathon2024.aspx; চুনতি ডটকম, “About Us,” https://chunati.com/AboutUs.aspx।চুনতি ডটকম, “খান ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে চুনতিতে দিনব্যাপী চক্ষু শিবির ২০২৫,” https://chunati.com/eventshappening/eventshappeningitem.aspx?EventsId=28।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, “চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শাখার কার্যক্রম,” https://dnc.gov.bd/site/page/a959e201-9b73-4198-b32b-a8156166ab99/; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, “Improving prevention and treatment for drug use disorders,” https://www.who.int/activities/improving-prevention-and-treatment-for-drug-use-disorders; জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি, https://ncsa.gov.bd/।স্রেডা, “National Solar Help Desk: Rooftop Solar Projects under Net Metering,” https://www.nshd.sreda.gov.bd/page?pid=6; বিদ্যুৎ বিভাগ, “Net Metering Guideline 2025,” https://powerdivision.gov.bd/pages/files/6948fac3559d93a15090eea0।কাইছার হামিদ, “বিনামূল্যে প্রযুক্তি শিক্ষায় ভরসা চুনতি লাইটহাউস,” সমকাল, ১০ জুন ২০২৩, https://samakal.com/whole-country/article/177565/; “আলো ছড়াচ্ছে চুনতি লাইটহাউস,” কালবেলা, ২১ নভেম্বর ২০২৩, https://www.kalbela.com/chittagong-sarabela/40806।চুনতি ডটকম, “চুনতী হযরত শাহ ছাহেব ও তাঁর কৃতি মাহফিলে সীরতুন্নবী,” https://www.chunati.com/writerscolumn/writerscolumnitem.aspx?writingid=620; চুনতি ডটকম, “Siratunnabi,” https://chunati.com/siratunnabi/siratunnabi.aspx।“উদ্বোধনের ১১ মাসেও চালু হয়নি,” দৈনিক আজাদী, https://dainikazadi.net/উদ্বোধনের-১১-মাসেও-চালু-হ/; “পড়ে আছে ৪ কোটি টাকার হাসপাতাল,” সমকাল, https://samakal.com/whole-country/article/201888/পড়ে-আছে-৪-কোটি-টাকার-হাসপাতাল।ছাইফুল হুদা ছিদ্দিকী, “The door of amicable possibilities,” চুনতি ডটকম, ৩ আগস্ট ২০১৭, https://www.chunati.com/news/newsitem.aspx?newsid=58; “চুনতির দুর্গম জনপদে শিক্ষার বাতিঘর বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়,” চুনতি ডটকম, https://www.chunati.com/writerscolumn/writerscolumnitem.aspx?writingid=744; শিক্ষক বাতায়ন, “চুনতি মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়,” https://www.teachers.gov.bd/blog/details/633052।চুনতি ডটকম, “Background history of Chunati Hakimia Government Primary School,” https://chunati.com/edinstitution/educationalinstitutionitem.aspx?topicid=148।চুনতি ডটকম, “History of Chunati,” https://chunati.com/history/history.aspx (মাদরাসার ১৯৪০ সালের আবেদন এবং স্থানীয় ইতিহাসের তালিকা)।চুনতি ডটকম, “Chunati at a Glance,” https://chunati.com/about/aboutitem.aspx?postid=13।চুনতি ডটকম, “স্বর্ণগ্রামের উপাখ্যান,” https://www.chunati.com/writerscolumn/writerscolumnitem.aspx?writingid=308।চুনতি ডটকম, “চুনতি লাইটহাউস ও ক্লাব একাত্তরের যৌথ উদ্যোগে একুশে বিতর্ক প্রতিযোগিতা সম্পন্ন,” https://www.chunati.com/news/newsitem.aspx?newsid=783।চুনতি ডটকম, “চুনতি লাইটহাউস পক্ষ থেকে কৃতি বিতার্কিকের জন্য ফ্রি কম্পিউটার কোর্সের ব্যবস্থা,” https://chunati.com/news/newsitem.aspx?newsid=687।চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, “চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য,” https://wildlifedivision.chittagongdiv.gov.bd/pages/static-pages/6991130335ce18e1c0739a7c।
Make sure you enter the(*)required information